দাকোপের এই মুক্তিযোদ্ধার দিন চলে দিনমজুরিতে

দাকোপের মুক্তিযোদ্ধা অমূল্য বাওয়ালীদাকোপ (খুলনা) : সময়টা ১৩ ডিসেম্বর  রবিবার বিকেল ৫টা। দাকোপের বাজুয়া -খুটাখালী বাজারের বাঁধ, কালি শীলের চায়ের দোকান। চা পান করতে করতে দোকানে রাখা টেলিভিশনে খবর দেখছেন প্রায় জনা ত্রিশ মানুষ। হঠাৎ একজন বৃদ্ধ গামছা গায়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে এসে এক কাপ চা খেতে চাইলেন। দোকান্দার চা দিলে তিনি বেঞ্চে বসে চা পান করে উঠে চায়ের দাম দিতে চাইলে দোকান্দার বলেন, চায়ের দাম দেওয়া লাগবে না। সাথে সাথে বলে উঠলেন ‘‘যারা মুক্তি যুদ্ধের বিরোধী ছিল তাদের অনেকে ভূয়া সার্টিফিকেট দেখিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সকল সুবিধা পাচ্ছে, আর তুমি যুদ্ধ করেও কিছু পেলেনা।’’

কপালের কি পরিহাস! এ কথা শোনার পর নজর গেল সেই অসুস্থ্য বৃদ্ধ মুক্তি যোদ্ধার উপর। ততক্ষনে তিনি উঠে দক্ষিণ দিকে মোটর সাইকেল স্ট্রান্ডের পথে যেতে শুরু করেছেন। আমি দ্রুত হেঁটে গিয়ে তিনবার বললাম , দাদু কেমন আছেন? তিনি আমাকে কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁটতে লাগলেন।

পরিস্থিতি বুঝে পাশের থেকে একজন দোকান্দার বলেন, উনি কানে শুনতে পাননা। তারপর আমি ওনার হাত ধরে একটি দোকানের টুলে বসালাম। বার্ধক্যজনিত  কারণে শ্রবন প্রতিবন্ধী এবং দন্তহীন গালের এই মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে অনেক জোরে কথা বলে জানতে পারলাম। তাঁর জীবনের অনেক কাহিনী।

তাঁর নাম অমূল্য বাওয়ালী, পিতার নাম- মৃত নকুল বাওয়ালী, মাতার নাম-মৃত ফুলবাসী বাওয়ালী বাড়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের দশঘর এলাকাতে ছিল। স্বাধীনতার পর তিনি বিবাহ করেণ এবং একই উপজেলার বাজুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাজুয়াতে ৪ কাঠা জায়গা কিনে বসবাস শুরু করেন।

তিনি জানান, ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় তখন তার বয়স ৩৫ বছর। তৃতীয় শ্রেনী পাশ এই যুবক জানতে পারেণ মুক্তি যোদ্ধাদের ভারতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধে যাওয়ার তার প্রচন্ড ইচ্ছা তাই ভারতে গিয়ে মানাভাটা ক্যাম্প থেকে মা ,বাবাকে না জানিয়ে পালিয়ে বশিরহাট ময়লাঘাটা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ভর্তি হন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং হাতিয়ার নিয়ে তিনি মুক্তি যোদ্ধা কমান্ডার বরিশালের যুবক অমরেশ মন্ডলের দলে যোগ দেন।

অমূল্য জানান, সাতক্ষিরা এবং মোংলা বন্দরের যুদ্ধে তিনি পাক সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি শুধুমাত্র কমান্ডার ছাড়া তার সহযোদ্ধাদের  নাম এখন আর মনে করতে পারেণ না। তিনি জানান যুদ্ধ শেষ হলে স্বাধীনতার পর তিনি বাসন্তি নামের এক বালিকাকে বিবাহ করেণ। তাঁর স্ত্রী তাঁকে ভিষন ভালবাসত। স্বামী যাতে আবার যুদ্ধে না যেতে পারে তাই নিরক্ষর এই সহধর্মিনী  মুক্তিযোদ্ধা স্বামীর পরিচয় পত্রটি পুড়িয়ে ফেলে। সেদিন কে জানতো এই পরিচয় পত্র একদিন কাজে লাগতে পারে! পরে যখন সরকারীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করা হয় তখন অমূল্য তার পরিচয়গত্র দেখাতে না পারায় মুক্তিযোদ্ধার সম্মান এবং মাসিক ভাতা থেকে বঞ্চিত হল।

এক ছেলে ও চার কন্যার জনক অমূল্য অন্যের বাড়ীতে কাজ করে বহু কষ্ট করে ছেলে মেয়েদের  বড় করেছেন বিবাহ দিয়েছেন। তাদের নিজ নিজ পরিবার হয়েছে। অমূল্যও অতি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তার নিজের আয়-ইনকাম না থাকায় ছেলে মেয়েরা বাবাকে আর  দেখে না। অমূল্য প্রতিদিন হোটেল- রেস্তোরায় পানি দিয়ে, কাঠ চেরাই করে যা পায় তা দিয়ে কোনোমতে স্ত্রীকে নিয়ে সংসার কাটায়।

অমূল্য জানান প্রতিদিন তাঁরা তিন বেলা খেতে পায়না, রোগে চিকিৎসা হতে পারেনা, এখন শুধূ মৃত্যুর জন্য দিন গোনা ছাড়া তাঁদের করার কিছুই নেই। কয়দিন পর ১৬ ডিসেম্বর  বিজয় দিবস তার অনুভূতি জানতে চাইলে অমূল্যর চোখ জলে ভিজে চক চক করে ওঠে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজেকে সামলে তিনি বলেণ,দেশে আর পাকিস্থানীরা নেই,দেশ স্বাধিন হয়েছে সবাই ভালো থাকুক।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাওলাদ হোসেন বলেন, তিনি অমূল্যকে চিনেন না বা অমূল্য কোনোদিন তার কাছে এসে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পরিচয় দেন নি।

বাজুয়ার সমাজসেবী কালিপদ শীল ও আওয়ামীলীগের প্রবীন নেতা  লাউডোবের যতীন্দ্রনাথ গাইন বলেন, অমূল্য বাওয়ালী স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহন করেছিলেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁকে সম্মান করা উচিৎ।

//দীপক রায়/উপকূল বাংলাদেশ/দাকোপ-খুলনা/১৪১২২০১৫//


এ বিভাগের আরো খবর...
‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন ‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন
বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক
পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন
উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প
কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’ কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’
শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন
জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল
একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’ একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’
‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার ‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার
কুয়াকাটায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত কুয়াকাটায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত

দাকোপের এই মুক্তিযোদ্ধার দিন চলে দিনমজুরিতে
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)