সেই সাউথখালী আজও অরক্ষিত!

সাউথখালীর বেড়িবাঁধ এখনও অরক্ষিতশরণখোলা (বাগেরহাট) : ১৫ নভেম্বর ভয়াল সিডর দিবস। ২০০৭ সালের  ১৫ নভেম্বর সুপার সাইক্লোন সিডর শরণখোলা সহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছিলো । সিডরের ৮ বছর পরেও নির্মীত হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ। এখনো হয়নি অনেকের মাথা গোঁজার ঠাই। সিডরের কথা মনে করে মানুষ এখনো আৎকে ওঠে।

সিডরের পর দীর্ঘ আট বছর পার হলেও  উপকূলীয় এলাকার মানুষের প্রানের দাবী টেকসই বেড়ি বাঁধ নির্মান করা সম্ভব হয়নি আজও। বাগেরহাটের শরণখোলার ৩৫/১ পোল্ডারের কিছু কিছু অংশের বাঁধে বাড়তি মাটি দিয়ে সিসি ব্লক স্থাপন করে টেকসই বাঁধের কথা বলা হলেও অধিকাংশ জায়গাই রয়েছে মাটির সরু রাস্তা দিয়ে ঘেরা । কোন কোন অংশের বেড়িবাঁধ আবার ইতোমধ্যেই নদী গর্ভে সম্পূর্ন বিলীন হয়ে গেছে।

এ অবস্থায় চরম আতংকিত হয়ে বসবাস করছে নদী তীরবর্তি শরণখোলা উপজেলার প্রায় ২০ হাজার মানুষ । সরকার আর দাতা সংস্থাগুলোর  প্রতিশ্রুতির জালে বন্দি করে রাখা হয়েছে  সিডর ও আইলা বিধ্বস্ত জনপদের মানুষদেরকে । এলাকা ঘুরে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানাগেছে এসব তথ্য।

শরণখোলা উপজেলার বলেশ্বর নদী তীর বর্তি বগী গ্রামে গিয়ে কথা হয় মো: আঃ রশীদের সাথে। তার ভাষায়, টেকসই বেড়িবাধ কইর‌্যা দেবে সিডরের পর থেইক্কাই সবাই আশা দিয়া আইতে আছে। কিন্তু টেকসই বেড়িবাঁধের কোন দেহা-সাক্ষাত নাই।

‘মোরা শ্যাস হইয়া যাওয়ার পর কি টেকসই বাঁধ দেবে সরকার?’ উপজেলার তাফালবাড়ির নদী পাড়ের বাসিন্দা জহরা বেগমের এমন প্রশ্ন। তাঁর ভাষায়, ‘ভয়তে রাইতে ঘুমাইতে পারিনা, কোন্ সময় যেন নদীর পানি আইয়া মোগো চুবাইয়া মারে। উচা-শক্ত বান্দা না হইলে মোরা বাচতে পারমুনা।’

শরণখোলা উপজেলার  সাউথখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: মোজাম্মেল হোসেন জানান, উপকূলীয় এ এলাকার মানুষের বাঁচা মরা অনেকটাই নির্ভর করে বলেশ্বর তীরবর্তি বেড়ি বাঁধের উপর। এই বাঁধ ভেঙ্গেই ২০০৭ সালের  ১৫ নভেম্বর সিডরে সাউথখালী  ইউনিয়নের প্রায় সাত শত মানুষ মারা যায়। ধ্বংশ হয়ে যায় ঘর-বাড়ি সহ সব কিছু। সেই থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে টেকসই বেড়ি বাঁধ তৈরি করে দেয়ার। এখনো আবার শোনা যায় বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে শীঘ্রই টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মান করা হবে। কবে নাগাদ টেকসই বেড়ি বাঁধ হবে তার বাস্তব খবর তাদের জানানেই।

জানতে চাইলে বাগেরহাট জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. মশিউর রহমান বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের অর্থ্যায়নে৩৫০ কোটি টাকা ব্যায়ে ৩৫/১ পোল্ডারের  ৬২.৭২ কি.মি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মানের কাজ শিঘ্রই শুরু হবে। ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহনের কাজ শুরু হয়েছে ।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের  ১৫ নভেম্বর রাতে ২৪০/২৫০ কিলোমিটার বেগে উপকূলীয় এলাকা দিয়ে বয়ে যায় প্রলয়ংকরি ঘূর্নিঝড় সিডর। মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে উপকুলীয় জনপদ পরিনত হয় ধ্বংসস্তুপে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি গ্রস্থ হয় বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার বলেশ্বর নদ তীরবর্তি এলাকার হাজার হাজার মানুষ। বিশেষ করে উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়ন পরিনত হয় বিরান ভুমিতে। সেখানের ৭ টি গ্রাম থেকে ৬ শতাধিক মানুষ মারা যায়। শুধু দক্ষিন ও উত্তর সাউথখালী  গ্রাম থেকেই মারা যায় প্রায় ৪ শতাধিক মানুষ।

এ ছাড়া উপজেলার চালরায়েন্দা, কদমতলা সহ অন্যান্য গ্রাম থেকে মারা যায় দেড় শতাধিক  মানুষ । জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলাসহ অন্যান্য এলাকায় নিহত হয় দেড় শতাধিক । মৃতের অধিকাংশই ছিল মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধ । নিখোজ লোকের সংখ্যা ৬৩ জন। সিডর আঘাতে বাগেরহাট জেলায় ১১ হাজার ৪’শ ২৮ জন আহত হন । এর মধ্যে শরণখোলায় আহত হন প্রায় ৯ হাজার মানুষ। জেলায় সম্পূর্ন বিধ্বস্ত ঘরের সংখ্যা ৬৩ হাজার  ৬’শ। এর মধ্যে শরণখোলায় বিধ্বস্তের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার ।

এ ছাড়া জেলায় আংশিক বিধ্বস্ত ঘরের সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজার। সম্পূর্ন বিধ্বস্ত পাকা রাস্তা ৫ কি.মি। কাচাঁ রাস্তা ৫০ কি.মি। বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয় ১৬.৫ কি.মি। ক্ষতিগ্রস্থ হয় ২০৬ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চার হাজার ৭’শ ৬৯ টি নৌকা ট্রলার নিখোজ হয়। মৃত্যু হয় ১৭ হাজার ২৩ টি গবাদি পশুর । নষ্ট হয় ১২ হাজার হেক্টর জমির ফসল। ক্ষতি গ্রস্থ হয় ৮ হাজার আটশত ৮৯ হেক্টর চিংড়ি ঘেড় ।

অপরদিকে,বলেশ্বর নদী সংলগ্ন ৩৫/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধের বাইরে থাকা উপজেলার বগী এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা গাউস ফারুকী, রুস্তম আলী হাওলাদার, আলম মুন্সী ও বলেশ্বর নদী সংলগ্ন উত্তর কদমতলা এলাকার বাসিন্দা দিন মজুর নুরুল ইসলাম, মালেক হাওলাদার, সৈয়দ হাওলাদার ও খাদিজা বেগম সহ শত শত বাসিন্দা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে খুপড়ি ঘরে দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে মোকাবেলা করে বসবাস করলেও এ পর্যন্ত কোন আশ্রয় খুজে পাননি তারা। পাশাপাশি  আশ্রয় নেয়ার তেমন কোন জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে ৩৫/১ পোল্ডারের ভেরীবাঁধের উভয় পার্শে সরকারী বিভিন্ন খাস জমিতে মানবতের জীবন যাপন করছেন তারা।

২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝর সিডরে সর্বশ্ব হারালেও গত ৮ বছরেও মাথা গোঁজার ঠাঁই পাননি শরণখোলা উপজেলার কয়েক হাজার গৃহহীন পরিবার।

উপজেলা চেয়ারম্যান   মোঃ কামাল উদ্দিন আকন বলেন, সিডর পরবর্তী সময় বিভিন্ন দাতা সংস্থার দেয়া ঘর গুলো ইতোমধ্যে অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। এ অঞ্চলের মানুষের ঘুরে দাড়াতে হলে আবাসন, (গৃহহীনদের  মাথা গোঁজার ঠাঁই) টেকসই ভেরীভবাঁধ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের একান্ত প্রয়োজন।

//শেখ মোহাম্মদ আলী/উপকূল বাংলাদেশ/শরণখোলা-বাগেরহাট/১৫১১২০১৫//


এ বিভাগের আরো খবর...
‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন ‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন
বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক
পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন
উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প
কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’ কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’
শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন
জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল
একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’ একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’
‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার ‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার
কুয়াকাটায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত কুয়াকাটায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাংবাদিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত

সেই সাউথখালী আজও অরক্ষিত!
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)