বিশেষ ক্রোড়পত্র | সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৪ | ঢাকা থেকে প্রকাশিত

ইপসা’র গোলটেবিল

ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ১ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সোমবার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসার উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার বিষয়ক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। একই অনুষ্ঠানে ম্যাপিং স্টাডি রিপোর্টের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। আলোচনার সারসংক্ষেপ নিয়ে এই ক্রোড়পত্র

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ইপসা’র গোলটেবিলঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ১ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সোমবার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসার উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার বিষয়ক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। একই অনুষ্ঠানে ম্যাপিং স্টাডি রিপোর্টের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি।

দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মো. রফিকুল আলমের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া গোলটেবিল আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ইপসার প্রধান নির্বাহী মো: আরিফুর রহমান এবং অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলাপম্যান্ট স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. নিয়াজ আহমেদ খান। ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার’ শীর্ষক সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইপসার এইচএলপি প্রকল্পের টিম লিডার মোহাম্মদ শাহ্জাহান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ এন্ড ডেভেলাপম্যান্টের প্রধান নির্বাহী মো: সামসুদ্দোহা।

আলোচনা অংশ নেন জার্মান দুতাবাসের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জনাব সুজিত চৌধুরী, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের একেএম সিরাজুল ইসলাম, ডিজাস্টার ফোরামের গওহার নঈম ওয়ারা, সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের পরিচালক এলিসন সুব্রত বারই, বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের মিহির বিশ্বাস, নেটওয়ার্ক অব ক্লাইমেট চেঞ্জ, বাংলাদেশের মো. মিজানুর রহমান বিজয়, উন্নয়নধারা ট্রাষ্টের নির্বাহী পরিচালক আমিনুর রসুল বাবুল ও বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম-এর স্পেশাল করসপন্ডেন্ট রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

  1. ড. হাছান মাহমুদড. হাছান মাহমুদ এমপি
    চেয়ারম্যান, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

    স্থানচ্যুত মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানসহ মৌলিক অধিকারগুলো পূরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে গবেষনা করতে হবে এবং স্থানচ্যুত মানুষদের মনিটরিং প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হবে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক পরবর্তী সম্মেলনে জলবায়ু স্থানচ্যুতি প্রসঙ্গকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ সমূহের মধ্যে সর্ব প্রথম জলবায়ু পরিবর্তন কৌশলপত্র তৈরী করলেও সময়ের ধারাবাহিকতায় জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষদের পুনর্বাসন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সমন্বিত জলবায়ু পরিবর্তন নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
  2. ড. নিয়াজ আহমেদ খানড. নিয়াজ আহমেদ খান
    চেয়ারম্যান, ভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর গবেষণা খুবই কম। তবে আমরা একটিভিজমের ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে আছি। ডিপ্লোম্যাসি ও নেটওয়ার্কিংয়ের ক্ষেত্রেও আমাদের অবস্থান ভালোই বলা যায়। কারণ এক্ষেত্রে অনেক কাজ হয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে একটিভিজমকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমরা যারা রাজনীতি করছি না, তারাও কিন্তু ধারণা করছি রাজনীতির সহায়তা ছাড়া কোন পরিবর্তন আসবে না। রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং উন্নয়নকর্মীদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। এর পাশাপাশি গবেষণা বাড়াতে হবে। গবেষণা ছাড়া প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে না। আর তথ্য না থাকলে তো কাজ করা যাবে না।
  • মো. রফিকুল আলমমো. রফিকুল আলম
    নির্বাহী পরিচালক, দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা

    ইপসার সময়োপযোগী এই গোলটেবিল আলোচনার জন্য ধন্যবাদ জানাই। উপকূলের মানুষেরা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাদেরকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমি মনে করি, জেলেদের সমস্যা সবচেয়ে বেশি। প্রায় সাড়ে ৩ লাখ জেলে রয়েছে উপকূল অঞ্চলে। এদের মধ্যে অনেকেরই জমি নেই। তারা বাঁধের ধারে কিংবা সরকারি জমিতে বসবাস করছে। এই জেলেরা সমুদ্র-নদী থেকে মাছ আহরণ করে আমাদের পুষ্টির একটি বড় অংশ পূরণ করে। অথচ এদের জন্য আমরা মাথাগোঁজার ঠাঁই করে দিতে পারছি না। ভূমি বন্দোবস্তের জটিলতা নিরসন করা জরুরি।
  • মো: আরিফুর রহমানমো: আরিফুর রহমান
    প্রধান নির্বাহী, ইপসা

    বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু বিপদাপন্ন দেশগুলোর একটি। বছরে বছরে পরিবর্তনের মাত্রা প্রকট হচ্ছে। আর জনজীবনে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। মানুষ ছুটছে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে স্থানচ্যুত হচ্ছে। ইপসা এ বিষয়ে সারাদেশের তথ্য একত্রিত করার চেষ্টা করছে। এই আলোচনায় উত্থাপিত তথ্য-উপাত্ত স্থানচ্যুত মানুষদের পুনর্বাসন পরিকল্পনায় সহায়ক হবে বলে আমাদের ধারণা। এরই ধারাবাহিকতায় তারা ফিরে পাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই।
  • মোহাম্মদ শাহ্জাহানমোহাম্মদ শাহ্জাহান
    টিম লিডার, ইপসা এইচএলপি প্রকল্প

    বিশেষ ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। দুর্যোগের কারণে মানুষের প্রাণহানিসহ জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সেইসঙ্গে জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হচ্ছে। বসতবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে এসব মানুষ নি:স্ব হচ্ছে। এই সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জলবায়ু স্থানচ্যুতির সংকট ভবিষ্যতেই ঘটবে, এমন কোন নয়। বরং এই সংকট সমাধানের জন্য বিশ্বব্যাপী অধিকারভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহন এখন সময়ের দাবি।
  • মো: সামসুদ্দোহামো: সামসুদ্দোহা
    প্রধান নির্বাহী, সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট

    জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার কারণে মানুষের জীবিকার সুযোগ কমে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষের জীবিকায় বড় ধরণের পরিবর্তন আসছে। বহু মানুষ বাপ-দাদার আদি পেশা ছেড়ে দিয়ে শহরে এসে রিক্সা-ভ্যান চালানোসহ বিভিন্ন ধরণের মজুরের কাজ করছে। যতই দিন যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ততই প্রকট আকার ধারণ করছে। পরিবর্তনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাপক গবেষণা করা প্রয়োজন।
  • সুজিত চৌধুরীসুজিত চৌধুরী
    জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা, জার্মান দুতাবাস

    ইপসা আজকে জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের যে ইস্যুটি তুলে এসেছে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষ সারাজীবনে সঞ্চিত সম্পদ হারিয়ে নি:স্ব হচ্ছে। নিজের বাড়িঘর হারিয়ে শহরে গিয়েও সে মাথা গোঁজার ঠাঁই পায় না। এক সময় নিজের জমিতে আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করলেও তাকে শহরে গিয়ে মজুরের কাজ করতে হচ্ছে। তাও জুটছে না। এদের পুনর্বাসনসহ অধিকার নিশ্চিতরণে সরকারের বিশেষ নজর থাকবে বলে আশারাখি।
  • এ কে এম সিরাজুল ইসলামএ কে এম সিরাজুল ইসলাম
    নির্বাহী সদস্য, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন

    আমরা এখানে জলবায়ু উদ্বাস্তদের কথা বলছি। সারাদেশে বিপুল পরিমাণ জমি ভূমিদস্যুরা দখল করে রেখেছে। কৃষিজমিতে আবাসন করে তারা কৃষি জমি কমিয়ে ফেলছে। বহু খাসজমি রয়েছে প্রভাবশালীদের দখলে। বহু জলাধার বালু চাপা পড়ে যাচ্ছে। এরা কাদের ছত্রছায়ায় আছে। ভূমিদস্যুদের কেন আমরা শাস্তি দিতে পারছি না। সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। এইসব দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এর সঙ্গে জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে।
  • gawher-nayeem-wahra.JPGগওহার নঈম ওয়ারা
    আহবায়ক, ডিজাস্টার ফোরাম

    ডিজাষ্টার অ্যাক্টের মাধ্যমে সরকারি আমলাদের ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছে। ভাবতে হবে এই অ্যাক্টকে কিভাবে কার্যকর করা যায়। পরিবেশ-বৈরি ব্যবসা কর্মকান্ডের ফলে মানুষের ক্ষতির বিষয়গুলো আলোচনায় তুলতে হবে। সাইক্লোন শেলটারের ব্যবহার কমিয়ে মানুষের ঘর তৈরি করে দেয়ার কথা ভাবতে হবে। শক্ত করে বাঁধ তৈরি করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বাঁধ তৈরির একক কর্তৃত্ব না দিয়ে এক্ষেত্রে জনগনের অংশগ্রহন বাড়াতে হবে। সরকারের সেফটিনেট কর্মসূচির আওতায় বিপন্ন মানুষদের আনতে হবে।
  • এলিসন সুব্রত বারইএলিসন সুব্রত বারই
    পরিচালক, সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান
    সুস্পষ্ট দাবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থা থেকে এ বিষয়ে কাজ করতে হবে। অ্যাডভোকেসি এজেন্ডা নিয়ে এগোতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে দাবিগুলো আন্তর্জাতিক মহলে জোরালোভাবে তুলতে হবে। তবে এক্ষেত্রে জিও-এনজিও সমন্বয়টা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে নাগরিক সমাজকে সোচ্চার হতে হবে। যেকোন দুর্যোগে নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। সে কারণে নীতিমালায় নারী ইস্যু বিশেষ বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
  • মো. মিজানুর রহমান বিজয়মো. মিজানুর রহমান বিজয়
    সমন্বয়কারী, নেটওয়ার্ক অব ক্লাইমেট চেঞ্জ, বাংলাদেশ

    বিষয়টিকে আমি সমর্থন করি। দেশের উপকূল সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে। ওই এলাকাটি বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দেশে এত কাজ হচ্ছে, অথচ জলবায়ু পরিবর্তন নীতিমালা এখনও করা সম্ভব হয়নি। জলবায়ু ফান্ডের মনিটরিংয়ের কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দুর্যোগ অ্যাক্টে জলবায়ু ইস্যুটি ততটা জোরালোভাবে আসেনি। নতুন আবাস, নতুন ঘর, নতুন কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। ভূমি ও কৃষির আমুল সংস্কার করতে হবে।

  • আমিনুর রসুল বাবুলআমিনুর রসুল বাবুল
    নির্বাহী পরিচালক, উন্নয়নধারা ট্রাষ্ট

    উপকূলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমি বন্টনের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। মামলার কারণে অনেক এলাকায় ভূমি বন্দোবস্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এরফলে জলবায়ু স্থানচ্যুতদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যতা বেড়ে যাচ্ছে। নদীভাঙণে ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে। মানুষের ক্ষতির বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে নীতিমালা করতে হবে। আর সেই নীতিমালায় মানুষের অধিকারসমূহ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
  • মিহির বিশ্বাসমিহির বিশ্বাস
    সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন

    একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বহু মানুষ নি:স্ব হচ্ছে। বাড়িঘর হারিয়ে পথে বসছে। অনেকে কাজের সন্ধানে শহরে ছুটে আসছে। সেখানে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। কাজের সুযোগও মেলে না। এইসব মানুষেরা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে। অথচ এদের পুনর্বাসনে উদ্যোগের অভাব। ভূমিহীনদের খাসজমি বন্দোবস্তে আইন আছে, নীতিমালা আছে। এইসব নীতিমালার প্রয়োগ নেই। জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। খাসজমি থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের উদ্যোগ নিতে হবে।
  • রফিকুল ইসলামরফিকুল ইসলাম
    স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বাংলানিউজ২৪.কম

    দুর্যোগ-দুর্বিপাকে উপকূলের মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। নি:স্ব মানুষেরা পথে বসেছে। এক খন্ড খাসজমির জন্য তারা এচর থেকে ওচরে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু পায় না। নদীভাঙণে দশ-বারো বার বাড়ি বদল করে তারা সেই ভাঙণের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকে, কখন নদীর বুকে চর জেগে উঠবে। সেই চর জাগে ঠিকই, কিন্তু ভূমিহীন মানুষদের সেখানে ঠাঁই মেলে না। প্রভাবশালী মহলের কাছে জিম্মি থাকে তারা। জলবায়ু স্থানচ্যুত অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নতুন নীতিমালার পাশাপাশি প্রচলিত নীতিমালার প্রয়োগও অত্যন্ত জরুরি।
  •  

জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে সমন্বিত জলবায়ু নীতিমালা প্রণয়নের দাবি

  1. অতিথিদের হাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনবাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু বিপদাপন্ন দেশগুলোর একটি হিসাবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত যা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর মাত্রা আরো প্রকট রূপ নিচ্ছে। বিশেষ ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী তাদের বসতভিটা ও ভূমি হারিয়ে স্থানচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় ও নদী বিধৌত অঞ্চলগুলোতে ভিটে হারার মাত্রা বেশি পরিলক্ষিত হয়। দেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ২৬ টি জেলায় স্থানচ্যুত মানুষ সম্পর্কে তথ্য পাওযা গেছে এবং অনুমান করা হয় যে, বাংলাদেশে এই পর্যন্ত ৬০ লক্ষ লোক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানচ্যুত হয়েছে। তথাপি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সম্পদের অভাবের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব মানুষ নিজস্ব ঘর, ভূমি ও সম্পত্তি হারায় তাদের নতুন জীবন নির্মাণে বর্তমানে কোন সমন্বিত উদ্যোগ নেই। জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের সমস্যা সমাধানে অধিকার ভিত্তিক কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
  2. এরই প্রেক্ষাপটে ইয়ং পাওয়ার ইন স্যোশাল এ্যাকশন সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক সংস্থা ডিসপ্লেসমেন্ট সল্যুয়েশন-এর সহযোগিতায় ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশ হাউজিং, ল্যান্ড এন্ড প্রোপার্টি রাইটস ইনিটিয়েটিভ শিরোনামে জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের সমস্যা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিযোজন সম্পর্কিত বেশ কিছু নীতিমালা বাংলাদেশ সরকারের থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কোন নীতিমালা গ্রহণ করেনি। এই নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে ইপসা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মতবিনিময় করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইপসা ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে’জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। আলোচনা সভায় বক্তারা জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের সুরক্ষায় সমন্বিত নীতিমালা ও মনিটরিং প্রয়োজন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যমান সরকারি খাস জমি বন্দোবস্তি প্রক্রিয়া দূনীতিমুক্ত ও অবৈধ দখলমুক্ত করে জলবায়ু স্থানচ্যুত ভূমিহীনদের পুনর্বাসন করতে হবে। স্থানচ্যুত মানুষদের অগ্রাধিকার দিয়ে খাসজমি বন্টনে এ সংক্রান্ত নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অথচ এর জন্য উন্নত বিশ্বের ভূমিকাই বেশী। এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত।

জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানচ্যুতি সংক্রান্ত বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ম্যাপিং ষ্টাডির মোড়ক উন্মোচন

  1. bbb1.jpgজলবায়ু পরিবর্তন ও ক্ষতিগ্রস্থ স্থানচ্যুত মানুষের পুনবার্সন সংক্রান্ত কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকাররি উন্নয়ন সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দাতাসংস্থা, বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ  নিয়োজিত ও ইপসা ও ডিসপ্লেসমেন্ট সলিউশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ম্যাপিং ষ্টাডি “ক্লাইমেট ডিসপ্লেসমেন্ট ইন বাংলাদেশ: স্টেকহোল্ডারস, লস এন্ড পলিসিস-ম্যাপিং দি এক্সিসটিং ইনষ্টিটিউশনাল ফ্রেমওয়ার্ক” প্রতিবেদনটির মোড়ক আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেন প্রধান অতিথি ড. হাছান মাহমুদ। ম্যাপিং ষ্টাডি প্রতিবেদনে ১৬৮টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা এবং ৭৮ জন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে যারা বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিযোজন পন্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজের জন্য সুপরিচিত। বাংলাদেশ সরকারের ৩৬টি মন্ত্রনালয়, সংস্থা, প্রতিষ্ঠানের জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিযোজন সংক্রান্ত কার্যক্রম এই প্রতিবেদনে ব্যাখা করা হয়েছে। একইভাবে ২০টি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ; ১৪টি জাতীয় নাগরিক সংগঠন ও নেটওয়ার্ক; ৪৫টি জাতীয় ও ২৩টি আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা; ৩০টি একাডেমিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের
  2. পরিচিতি এই ম্যাপিং ষ্টাডিতে অন্তভূক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি, বেসরকারি, গবেষণা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিযোজন ব্যবস্থাপনা নিয়ে কর্মরত ৭৮ জন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির নাম ও তাদের পরিচিতি ম্যাপিং ষ্টাডিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া এ প্রতিবেদনের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হছে বাংলাদেশে বিদ্যমান ২২ টি আইন,  নীতিমালা, পরিকল্পনা ও কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইপসার প্রণীত ম্যাপিং ষ্টাডির মাধ্যমে জলবায়ু স্থানচ্যুত মানষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কার্যকর  ও শক্তিশালীকরণর জন্য কিছু সুপারিশমালা উপস্থাপন করা হয়েছে : (১) জলবায়ু স্থানচ্যুতি ইস্যু সংক্রান্ত বিদ্যমান জাতীয় আইন ও নীতিমালাসমূহ পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ করা ; (২) জলবায়ু স্থানচ্যুতি ইস্যু সংক্রান্ত অধিকার ভিত্তিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা; (৩) জলবায়ু স্থানচ্যুতি বিষয়ক বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পর্যালোচনা ও পুন: সংষ্কার করা; (৪) জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের জন্য দেশীয়  ভূমি সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা; (৫) জলবায়ু স্থানচ্যুতি সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক দাতাসমূহের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বৃদ্ধি করা ; (৬) বাংলাদেশে জলবায়ু স্থানচ্যুতি বিষয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও এনজিওসমূহের মধ্যে কার্যকর জোট গঠন করা ; এবং (৭) সরকার এবং সিভিল সোসাইটির সংগঠনসমূহের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও যোগাযোগের মাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের সমস্যা অনেকাংশে সমাধান সম্ভব।


ইপসা’র গোলটেবিল
(পাতাটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet